করনা ভাইরাস নামক মহামারির কারনে লকডাউন শব্দটি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছে

লকডাউন এই শব্দটির সাথে আমাদের আগে পরিচিতি না থাকলেও পৃথিবীর এখন প্রায় প্রতিটি মানুষ এর সাথে পরিচিত। আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে লকডাউন আর করোনা ভাইরাস এর মতো শব্দগুলি। ২০২০ সাল যেন মানবজাতির জীবনে অভিশাপ বয়ে এনেছে।

মার্চ মাসের থেকেই পৃথিবীর প্রায় ছোট বড় সমস্ত দেশের মানুষই মহামারীর বা অতিমারীর আতঙ্কের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছে। লকডাউনের জেরে সাধারণ মানুষকে হতে হয়েছে ঘরবন্দি। কিন্তু ভেবে দেখবেন যে আমরা কিন্তু করোনা ভাইরাস আর লকডাউন থেকে অনেক জিনিস শিখেছি।

লকডাউন থেকে আমাদের  জীবনের কিছু গুরুত্ব পূর্ণ শিক্ষা

আপনাকে যদি বলি লকডাউন এ আপনি কি শিখলেন? তাহলে আপনারা হয়তো অনেকেই বলবেন রান্না করা শিখেছেন, নতুন রেসিপি বানাতে শিখেছেন, ঘরের কাজ করা শিখেছেন, ইত্যাদি। এসব তো খুবই ভালো। জীবনে অনেক কিছুই শিখে রাখা উচিত। সবই কখনো না কখনো কাজে লাগবে একদিন।

কিন্তু আমি আজ আপনাদের সাথে আলোচনা করবো যে বিষয়ে তা হলো এমন ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা লকডাউন গোটা মানবজাতিকে শিখিয়ে দিয়েছে।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের পরিবার যেন ধীরে ধীরে আরো দূরে যেতে চলেছে। সেই আগের মতো একান্নবর্তী পরিবার আর প্রায় দেখাই যায়না। অনু পরিবার থেকেও বাড়ির সদস্য যেমন বাড়ির ছেলে বা মেয়ে চাকরি, পড়াশুনোর জন্যে আলাদা শহরে বা রাজ্যে থাকতে বাধ্য হয়।

ছোট পরিবারের মধ্যেও অফিসের কাজের চাপে বাড়ির লোকজনের সাথে সময় কাটাতে পারেনা আমাদের মধ্যে অনেকেই। এই লকডাউনে বাড়িতে থাকতে বাধ্য হতে হয়েছে সাধারণ মানুষ। অন্তত আর কিছু না হোক পরিবারের মানুষের সাথে অনেক্ষন সময় কাটানোর মতো সৌভাগ্য তো অনেকেরই হয়েছে।

জীবনে পরিবারের গুরুত্ব

আর যাদের এই সৌভাগ্যই হয়নি দিনের পর দিন পরিবারের থেকে আলাদা থাকতে বাধ্য হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকার জন্যে তারাও বুঝতে পারছে জীবনে পরিবারের গুরুত্ব। লকডাউন, করোনা এসবের আগে জীবন তো বেশ চলছিল। রেস্তোরায় খাওয়াদাওয়া, ফুচকা, চাউমিন, খেয়ে তো দিব্যি চলছিল।

কিন্তু এই করোনা ভাইরাস এর আক্রমণ হওয়ার পর থেকে মানুষ লাগাতার টিভিতে ও খবরে বিভিন্ন ডাক্তারদের উপদেশ শুনেছে। অন্তত মানুষ করোনা এর ভয়ে নিজের দেহের রোগপ্রতিরোধ বাড়াবার জন্যে ভালো অভ্যেস গুলোকে নিজেদের জীবনে রপ্ত করছে। যেমন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, এর পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যেসও আমাদের মধ্যে অনেককেই নতুন করে চালু করে দিয়েছে।

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনের গল্প জো বাইডেন

এর পাশাপাশি নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যেস খুবই জরুরি সুস্থ থাকার জন্যে। অন্ততপক্ষে এটা আমাদের সবার মাথায় ঢুকে গেছে যে সুস্থ থাকাটা ও স্বাস্থ্যবান হওয়া সবথেকে জরুরি। কি আমি ঠিক বলেছি তো? আপনার কি জানা আছে? যে শুধু লকডাউনেই ভারতে প্রায় ৩০০ এর বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে আপনার কি জানা আছে? চিকিৎসকদের মতে আত্মহত্যা ও মানসিক হতাশা একটি মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে।

মাসনসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত

এর কারণ লকডাউনের ফলে ঘটে যাওয়া আর্থিক মন্দা, জীবিকার অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব ইত্যাদি। আমাদের এটা বোঝা হয়ে গেছে যে শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা খুবই জরুরি। আর আপনার পরিবারের কেউ যদি মাসনসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত মনে হয় তো অবশ্যই তার পাশে থাকবেন।

দিনের পর দিন লকডাউন এ সমস্ত শপিংমল, সেলুন, বিউটি পার্লার, ক্লাব, সিনেমাহল, সবই থেকেছে বন্ধ। শহরের সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিলাসিতা মুছে গিয়েছে। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় দ্রব্যের যোগান থেকেছে। সাধারণ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ তো বুঝতেই পেরে গিয়েছে বিলাসিতাহীন সাধারণ জীবনযাপন যথেষ্ট সম্ভব।

ভিনগ্রহী উপগ্রহ আমাদের ওপরে নজর রাখছেন

অল্প খরচে কিভাবে জীবনযাপন করা যায় মানুষের তা বোধগম্য হয়ে গেছে। লকডাউনে আপনি এটা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই যে, যেসব মানুষ অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবায় যুক্ত তারা আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন বাড়ির কাজের লোক, পাড়ায় পৌরসভার মেথর, এনারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সাতদিন যদি এনাদের পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায় ভাবতে পারছেন কি হতে পারে?

এই লকডাউন এটা আমাদের ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েছে যে এনাদের গুরুত্ব কতটা। এনাদের সবসময় যথাযথ সম্মান দেবেন। যদি আপনার ফ্রিজে খাবার থাকে আপনার পিঠে কাপড় থাকে আপনার মাথার উপর একটি ছাদ থাকে এবং ঘুমানোর জায়গা হয় তবে আপনি বিশ্বের ৭৫% এর চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ।

মানিব্যাগে কিছু অতিরিক্ত টাকাপয়সা থাকে তবে

যদি আপনার ব্যাঙ্কে অর্থ থাকে, এবং আপনার মানিব্যাগে কিছু অতিরিক্ত টাকাপয়সা থাকে তবে আপনি বিশ্বের ৮% ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন। লকডাউনে যদি আপনার উপার্জন না বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আপনি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করুন। ভেবে দেখুন আমাদের দেশ ভারতের কোটি কোটি শ্রমিক ভাইদের কথা।

যারা কাজ হারিয়ে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত খালিপায়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক শ্রমিক ভাইদের দুর্ঘটনায় মৃত্যুও ঘটে গিয়েছে। এই লকডাউন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে টাকা পয়সা থাকলেই সবকিছু কেনা যায়না।

ফেসবুক ও ইউটিউব জগতে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় মূখ সালমান শুখন

কে গরিব আর কেই বা ধনী, কে উচ্চ আর কেই বা নিম্ন, কে বিখ্যাত আর কেই বা সাধারণ, করোনা ভাইরাস এর সামনে আমরা সবাই সমান। আমরা প্রত্যেকেই সমানভাবে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছি। লকডাউনে টাকা দিয়েও আমরা অত্যাবশ্যকীয় জিনিস ছাড়া অন্য কিছু কিনতে পারিনি।

আমরা টাকা দিয়ে মানসিক শান্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এগুলো কিনতে পেরেছি কি? লকডাউনে পুরো পৃথিবীর ছোট থেকে বড় সব দেশেই জীবনযাত্রা থেমে গিয়েছিলো। যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানবাহন সম্পূর্ণ বন্ধ। মাসের পর মাস মানুষের অনুপস্থিতিতে দূষণের মাত্রা সারা পৃথিবীতে কমে গিয়েছিল।

পৃথিবী কিছুদিনের জন্যে রেহাই পেয়েছিলো

গ্লোবাল ওয়ার্মিং থেকে পৃথিবী কিছুদিনের জন্যে রেহাই পেয়েছিলো। সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন জায়গায় প্রাণিজগতে আচার আচরণ দেখা গিয়েছিলো। শহরের পাশে সমুদ্রে ডলফিন ঘুরবার বিরল দৃশ্য বা ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। বিভিন্ন শহরে বন্যপ্রাণীদের বিচরণ করতেও দেখা গেছে এমনকি বিরল প্রাণীও অনেক বছর দেখা পাওয়া গেছে।

কোথাও না কোথাও এমন মনে হয় যে আসলে করোনা ভাইরাস নয় আমরা অর্থাৎ মানবজাতি পৃথিবীর বুকে ভাইরাস। আপনারা দুই মাসের কোয়ারান্টিনে থেকে এতো অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন? ভেবে দেখেছেন কি চিড়িয়াখানায় থাকায় প্রাণীগুলো বছরের পর বছর বন্দি জীবন যাপন করে তাদের অনুভূতিটা কখনো ভেবেছেন? নিজেকে পশুপ্রেমী বলে মনে করেন? তো চিড়িয়াখানাতে পশুপাখিদের বন্দি রাখার বিরুদ্ধে অবশ্যই আওয়াজ তুলুন।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া গুলিকে ব্যবহার করে আপনারা এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারেন। এই অতিমারীর সময়ে মনে হয়েছে কি যে পৃথিবীতে কোনো জায়গাতেই মানুষ পালিয়ে এর হাত থেকে বাঁচতে পারবেনা। হ্যাঁ সত্যিই হতে চলেছে আরো ভয়ানক।

বেশিরভাগ মানুষকে একসাথে ঘরবন্দি

সময় এসে গেছে পরিবেশকে রক্ষা করার জোরকদমে নয়তো এর পরে যে বিপর্যয়গুলি আসতে চলেছে তার সামনে এই মহামারী তো খুবই ছোট মনে হবে। আপনি সত্যিই কোথাও পালিয়ে নিজেকে বাঁচাতে পারবেননা।

করোনা ভাইরাস মহামারী যেভাবে সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো এবং পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষকে একসাথে ঘরবন্দি করে দিলো, আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে দেশের সীমানা বা গন্ডীগুলো আসলে কিছুই না। আমাদের রাজনৈতিক ও অন্যান্য মতামতের ভেদের জন্যে আমরা অর্থাৎ মানবজাতি পৃথিবীকে টুকরো করে রেখেছি।

ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থ মহাউপনিষদের এই শ্লোক – ।বসুধৈব কুটুম্বকম্। যার অর্থ সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার এটি যে চিরাচরিত সত্য তা আমাদের বোঝা উচিত। আর এটাই আমাদের সবথেকে বড় শিক্ষা। আর্টিকেলটি যদি ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। আর হ্যাঁ কমেন্টে অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না যে আপনি এই লকডাউন থেকে কি কি শিখেছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published.