চীনের বিজ্ঞানী দ্বারা তৈরিকৃত ‘কৃত্রিম সূর্যের’ ব্যবহার ও তৈরির ইতিহাস

বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই নতুন কিছু উদ্ভাবন করেই চলেছেন ও মানবসভ্যতাকে বিকশিত করবার জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। মানবজাতি নিজেদের প্রয়োজনে এমন অনেক কিছু প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হওয়া জিনিসকে কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্টি করেছে। উদ্ভাবনের তালিকায় কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে শুরু করে প্রাণীর ক্লোন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে।

‘কৃত্রিম সূর্য’ ব্যবহার ও তৈরির ইতিহাস

এছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য রোবট থেকে শুরু করে কৃত্রিম মেঘ তৈরির কথাও শোনা গেছে। এবার বিজ্ঞানক্ষেত্রে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। এই বছরের ডিসেম্বর এর শুরুতে চীনের বিজ্ঞানীরা বানিয়ে ফেললেন একটি কৃত্রিম সূর্য।

তবে কৃত্রিমভাবে সূর্যের মতো আলো ও তাপ প্রদানকারী শক্তির উৎস চীনের বৈজ্ঞানিকরাই প্রথম নির্মাণ করেননি। এর আগে ২০১৭ সালে জার্মানির বৈজ্ঞানিকরা একটি কৃত্রিম সূর্য নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু কি কাজে লাগবে বিপুল পরিমাণে তাপ উৎপাদনকারী এই কৃত্রিম নক্ষত্র?

ভিনগ্রহী উপগ্রহ আমাদের ওপরে নজর রাখছেন

সূর্য আমাদের শক্তির একমাত্র প্রধান উৎস। সূর্যের আলোর জন্যেই পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সব দিন একইভাবে পৃথিবীতে সূর্য আলো ও তাপ ছড়ায় না। যে কারণে অনেক সময়ই বাধাগ্রস্ত হতে পারে মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড। এছাড়াও যেসমস্ত দেশে আবহাওয়ার জন্যে বহুদিন সূর্যের আলো ও তাপ ঠিকমতো পাওয়া যায়না সেখানে বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজ ও কৃষিকার্য যথেষ্ট ব্যাহত হয়।

শক্তির একমাত্র প্রধান উৎস সূর্য

এই প্রতিকূলতাকে এড়াতে বিভিন্নদেশের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে শক্তির উৎস তৈরী করবার জন্যে বহুদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে জার্মানির বিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে অনেক বড় একটি সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তিনতলা সমান উঁচু ১৪০ টি জেনন লাইট ল্যাম্পকে একত্রিত করে বিপুল মাত্রায় আলো ও তাপ উৎপন্ন করা হয়।

এই বছরের ডিসেম্বর এর শুরুতে চীনের বিজ্ঞানীরা একটি বড় সাফল্য অর্জন করে ফেললেন। নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বানিয়ে ফেলেন সূর্যের মতোই একটি বিকল্প শক্তির উৎস। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে শুক্রবার তারা সফলভাবে এইচএল-২ এম টোকামাক পারমাণবিক চুল্লি চালু করেছে।

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনের গল্প জো বাইডেন

চুল্লিটি চীনের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ফিউশন পরীক্ষামূলক গবেষণা যন্ত্র। চুল্লিটিতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তাপ ও শক্তির কারণে, এটিকে ‘কৃত্রিম সূর্য’ বলা হয়। ২০০৬ সাল থেকেই চিন পারমাণবিক ফিউশন চুল্লির ছোট সংস্করণ তৈরির কাজ করছিল। কৃত্রিম সূর্য’ কোনও সাধারণ পারমাণবিক চুল্লি নয়।

চিনের নতুন সূর্যের ইতিকথা

পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লিগুলিতে নিউক্লিয়ার ফিশন পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়। এই প্রক্রিয়ায়তে পরমাণুগুলি ক্রমাগত ভাঙতে থাকে। কিন্তু, কৃত্রিম সূর্যতে কাজে লাগানো হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়া, যা পরমাণুগুলিকে একীভূত করতে থাকে আর যার ফলে উৎপন্ন হয় বিপুল শক্তি। এই একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের নক্ষত্র সূর্য ক্রমাগত শক্তি উৎপন্ন করে চলেছে।

গরম প্লাজমা দ্রবীভূত করতে এই রিঅ্যাকটর ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র, এর ফলে এর তাপমাত্রা ১৫০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস টপকে যেতে পারে। অর্থাৎ সূর্যের থেকে উষ্ণতা ১০ গুণ বেশি। এদিকে ফ্রান্সে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম নিউক্লিয়ার ফিউশন রিসার্চ প্রজেক্ট, ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাকটর, কাজ শেষ হবে সম্ভবত ২০২৫-এ।

চীনের বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কর্মরত বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে কাজ করার সময় এই ‘কৃত্রিম সূর্য’ ব্যবহার করতে চান। চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দ্বারা জানা যায় যে পারমাণবিক ফিউশন শক্তির বিকাশ যে শুধুমাত্র চিনের কৌশলগত শক্তির চাহিদার সমাধান করবে তাই নয়, ভবিষ্যতে চিনের জ্বালানি ও জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্যও এটি তাত্পর্যপূর্ণ’। তবে ফিউশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। কৃত্রিম সূর্য চালু করতে আনুমানিক ২২৫০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.